।। ত্যানা ।।
আজ আমার কোন দাম নেই, কিন্তু জীবনের শুরুটা ঠিক এমন ছিল না। অনেক জীবের মতই আমারও একটা জীবনচক্র আছে। আছে বললে ভুল হবে, ছিল। ছিল কথাটা অতীত কাল নির্দেশক। আমি কিন্তু বর্তমান। মানুষ নামক এই পৃথীবির শ্রেষ্ঠ জীবের যেমন অতীত সবচেয়ে বর্ণিল, আমারও তাই। এ কারণে নিজ মনে নিজকে মাঝে মাঝে মানুষের সমকক্ষ ভাবতে খুব ইচ্ছে করে। ভাবিও, আমাকে কে আঁটকায়? আমার ভাবনার জগৎ শুধুই আমার।
ভাবতে ভাল লাগে কারণ, এক দিন যখন আমার ভরা যৌবন, তখন আমি ছিলাম মানুষেরই সবচেয়ে কাছের, একেবারে তার শরীর জড়িয়ে। সবচে প্রিয় যে জন, যাকে মানুষ নিঃসংকোচে সব উজাড় করে দিত, সেও আমাকে ভেদ করে, কিংবা উন্মোচন করেই তাঁর পরম প্রিয়কে আবিস্কার করত। আমারও বেশ লাগত। আমরা জড়রা যেটা উপলব্দি করতে পারি না, জীবেরটা দেখে বোঝার চেষ্টা করতাম ব্যাপারটা কেমন! প্রথম প্রথম আমাকে যখন গা ছাড়তে হত খুব মন খারাপ হত। ব্যাপারগুলো দেখার পর খুব উপভোগ করতাম, পাশে বসে মিটমিট করে হাসতাম।
আমি যখন সুতা হয়ে কারখানায় গেলাম, ওরা কি সব মেখে টেখে আমাকে মেশিনের ভিতর দিত, আমার খুব সুড়সুড়ি লাগত। তারপর হঠাৎ আমি কাপড় হয়ে গেলাম। তারপর কারখানায় কাটাকাটি করলো, আমার কিন্তু মানুষের মত ব্যাথা লাগে নি। গা শিরশির করত। আমি আমার রুপান্তর গুলো বেশ উপভোগ করতাম। শেষে সেলাই মেশিন, ফিনিশিং কী সব প্রক্রিয়া হয়ে আমি ড্রেস হয়ে গেলাম। আমার সাথের অন্যরা কেউ শিশু, কেউ পুরুষ পোশাক হল। আমি ফিমেল ড্রেস হিসেবে শো রুম হয়ে বহু জনমের ভাগ্য গুনে এক মহা সুন্দরী রমনীর নৈশ ড্রেস হয়ে তাঁর সয্যাশঙ্গী হয়ে গেলাম। আমার যে কী আনন্দ! খবর পেলাম, আমার বন্ধু যারা শিশু পোশাক ওদের গায়ে নিত্য গুমুত লেগে থাকে। আমি এসি রুমে ইস্ত্রি করে পাট করা হয়ে পটের বিবির অঙ্গ জড়িয়ে আছি। অনেক কথা, সব বলবো না। লজ্জা করে!
তবে সুখ বেশীদিন কপালে সইলো না। একদিন আমার এই জড় হৃদয় চুর্ণ করে আমাকে মেঝেতে ফেলে, আসবাব পত্রের গা ডলে ডলে সব ময়লা সাফ করলো। ভাবলাম বুঝি ধোয়ার আগে অমন করছে, পরে নিশ্চয়ই ইস্ত্রি করে আবার আমাকে গায়ে জড়াবে। আমি অপেক্ষায় থাকি, সে যে কী ভীষণ কষ্ট! ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকলাম। আমাকে পানিতে চুবিয়ে, চিপে, মেঝে মুছে মুছে শেষ করে দিল। দ্রুত আমার সুতা নরম হতে থাকল। কী করে যেন আমার নামটাও নাইটি থেকে হয়ে গেল “ত্যানা”। নাইটি নামটা আমার খুব পছন্দের, ত্যানা শুনলে ওয়াক করে বমি আসে। কিন্তু নিরুপায়।
আমি আর বেশীদিন টিকবো না। যে কোন সময় আমার সব সুতা ছিঁড়ে আমার ফেলো ত্যানাদের মতই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হব। তবে একেবারে নিঃশ্বেষ হবার আগে জীবনের শেষ একটা কথা জেনে মন ভাল হয়ে গেল। ত্যানা নামের গ্লানি আর নেই। আমার এই নামে মানুষ কি যেন বলাবলি করে। ত্যানা প্যাঁচাতে মানা করে। আহারে, আমার মালকিন যদি এই উপদেশটা মানতেন তবে কী ক্ষতি ছিল? আমাকে না পেঁচিয়ে যত্ন করে যদি ধীরে ধীরে ব্যবহার করত? আমার মত নির্জীবের অব্যক্ত বেদনা সমেত অন্তত জীবনটা টিকে থাকত!
ঢাকা, ১৭ইআগষ্ট, ২০১৬